মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক ফার্মাসিউটিক্যালস ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদর্শনী ‘এসইএকেয়ার ২০২৬’। ২০ মে শুরু হয়ে চলবে ২২ মে পর্যন্ত এই আয়োজনে বিশ্বের মোট নয়টি দেশের ১০৫টি প্রতিষ্ঠান অংশ নিচ্ছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এটি বছরের প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি এই আন্তর্জাতিক মেলায়, যা দেশের ওষুধশিল্প ও স্বাস্থ্যসেবা প্রযুক্তি খাতের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে ও ব্যবস্থাপনায় কুয়ালালামপুরের এই প্রদর্শনীতে চারটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। হাইকমিশনের স্টলে দেখানো হচ্ছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস, হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের বিভিন্ন ওষুধ ও স্বাস্থ্যপণ্য, এর পাশাপাশি পৃথক বুথে নিজেদের পণ্য ও তথ্য সরবরাহ করছে এরিবা ক্যাপসুলস লিমিটেড। আরো অংশ নিয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং প্রতিষ্ঠান ব্রাইন স্টেশন ২৩।
বিশ্ব বাণিজ্য ও শিল্পমেলায় এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন মালয়েশিয়ার ডেপুটি মিনিস্টার অব হেলথ দাতো হাজা হানিফা হাজার তৈয়ব। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, বিনিয়োগকারী, শিল্পোদ্যোক্তা ও স্বাস্থ্যখাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
উদ্বোধনী পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের হাইকমিশনের পক্ষ থেকে ক্ষিপ্র স্বাগত জানান হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন সক্ষমতা ও বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি এও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, মালয়েশিয়া ও আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের ওষুধপণ্যের রপ্তানি বাজার অব্যাহতভাবে সম্প্রসারিত হবে।
মালয়েশিয়ার ডেপুটি মিনিস্টার অব হেলথ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রশংসা করে বলেন, আন্তর্জাতিক এই প্রদর্শনী বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর জন্য মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ-আমেরিকা বাজারে প্রবেশের অন্যতম সেতুবন্ধন হবে। তিনি বাংলাদেশ হাইকমিশনকেও ধন্যবাদ জানান।
পরবর্তী সময়ে হাইকমিশনার এরেবা ক্যাপসুলসের বুথ পরিদর্শন করেন এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে তিনি বলেন, রপ্তানি বৃদ্ধি ও নতুন বাজারের জন্য পণ্যের বহুমুখিকতা অপরিহার্য। তিনি 강조 করেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক সমাবেশে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দেশের ওষুধশিল্পের আন্তর্জাতিক পরিচিতি বৃদ্ধি করবে এবং নতুন বাজারে প্রবেশের রোডম্যাপ তৈরি করবে। তিনি ভবিষ্যতেও আরও বেশি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
প্রদর্শনীর দ্বিতীয় দিনে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, শিক্ষার্থী, গবেষক ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা বাংলাদেশের পুঁজিপণ্য ও প্রযুক্তি জানার জন্য ঘনিষ্ঠভাবে পরিদর্শন করেন। তারা বাংলাদেশের মান, উৎপাদন ক্ষমতা ও পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক দামের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এসইএকেয়ার ২০২৬-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ কেবল একটি প্রদর্শনী নয়; বরং এটি আসিয়ান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর স্বাস্থ্য ও ওষুধবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। অন্যদিকে, প্রযুক্তিখাতে বাংলাদেশ তার সক্ষমতা প্রদর্শন করছে অনন্য নজরকাড়ছে। ব্রেইন স্টেশন ২৩, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণের ঘোষণা দিয়েছে।
তাদের তথ্যমতে, বর্তমানে তারা বিশ্বব্যাপী ৩৬টির বেশি দেশে অবস্থিত এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে তাদের অফিস রয়েছে। তারা এআই ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা, ইআরপি, ডেটা ইন্টেলিজেন্স, রোগী সম্পৃক্ততা, ফিল্ডফোর্স অটোমেশন, ওয়ার্কফ্লো অটোমেশন ও কাস্টম ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে কাজ করে চলেছেন।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও (দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়া) আফনান জানান, আসিয়ান অঞ্চলে স্বাস্থ্য ও ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে ডিজিটাল রূপান্তর ও আধুনিকীকরণের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারঅপারেবিলিটি, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও রোগীসংক্রান্ত প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের কোম্পানিগুলোর অন্যতম শক্তি হলো বড় প্রকল্প সামর্থ্য, ডোমেইন বিশেষজ্ঞতা, ব্যয় সাশ্রয়ী ও উচ্চমানের সেবা প্রদান। তারা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জোটবদ্ধ কাজ করছে যাতে দ্রুত প্রযুক্তিগত উপযোগিতা অর্জন ও পুরনো সিস্টেমের আধুনিকীকরণ সম্ভব হয়।
ব্রেইন স্টেশন ২৩ এর আন্তর্জাতিক ব্যবসা ও বিক্রয় বিভাগের কর্মকর্তা মোহাইমিন উল জোবায়ের জানান, বাংলাদেশভিত্তিক এই গ্লোবাল সফটওয়্যার কোম্পানি এআই, ইআরপি ও ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ব্যবসাগুলোর সমর্থন করে চলেছে। মালয়েশিয়া আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্র।
তিনি আরও জানান, ‘এসইএকেয়ার ২০২৬-এ বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে আমরা আমাদের স্মার্ট ইআরপি, অটোমেশন ও এআই-চালিত উদ্ভাবনী সমাধান প্রদর্শন করছি। ইতোমধ্যে ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালসসহ বেশ কিছু শীর্ষ কোম্পানির সঙ্গে কাজ করছি।’
প্রতিষ্ঠানটি ছড়িয়ে পড়ে বলে জানা গেছে, আসিয়ান অঞ্চলে স্বাস্থ্য সেবা ও ওষুধের হালনাগাদের জন্য তারা বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করতে আগ্রহী। কম খরচে উচ্চমানের প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে নিজেদের অবস্থান আরো দৃঢ় করতে চায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বিশ্ববাজারে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। রপ্তানি বৃদ্ধি এবং উৎপাদন মানের উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা চাহিদার শীর্ষে থাকায় বাংলাদেশি সফটওয়্যার ও আইটি খাতের জন্য নতুন দ্বার খোলা হচ্ছে।
এতে করে বোঝা যায়, এসইএকেয়ার ২০২৬-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুধুই একটি প্রদর্শনী নয়, বরং এটি দেশের ওষুধ ও প্রযুক্তি খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর উন্নয়নের পদক্ষেপ। সংশ্লিষ্টরা আশা করেন, নিয়মিত এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অংশগ্রহণ বাংলাদেশি পণ্যের ব্র্যান্ডিং, বাজার সম্প্রসারণ ও বিশ্বজনীন মুখ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে।









