সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত এবং দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে পলাতক থাকা সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে অবশেষে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নিজের পরিচয় পুরোপুরি লোপ করে ছদ্মবেশে থাকলেও শেষ রক্ষা হয়নি। গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, মোজাফফফর হোসেনের পলাবস্থার মূল কৌশলের পেছনে ছিল তার মেয়ের কর্মস্থলের তথ্য ও একটি নাকের নিচে থাকা জন্মদাগের অদ্ভুত চলাচল। এই সূত্র ধরে, বুধবার রাতে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে পুলিশ।
মূলত, তার মেয়ের একটি বেসরকারি টেলি কমপ্রানীর কর্মস্থলের তথ্য তার পলাতকের অবস্থানের মূল সূত্র হিসেবে কাজ করে। গোয়েন্দারা কয়েক মাস ধরে তার মেয়ের গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন এবং নির্দিষ্ট এলাকায় দুটি বাসা চিহ্নিত করেন। ছদ্মবেশে ওই বাসাকে নজরদারিতে রাখার পর, তার শারীরিক বৈশিষ্ট্য—নাকের নিচে থাকা একটি কালো দাগ বা আঁচিল—চিহ্নিত করা হয়।
সন্ধ্যায়, গোয়েন্দা দলের যৌথ অভিযানে তারা সাধারণ পোশাকে বাসায় যান। দরজা খোলার পর, তারা অফিসে কর্মরত হওয়ার ভান করে বন্ধুর পরিচয় দেন। আড় চোখে বাড়ির ভেতরে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি তাকে দেখা যায়, যিনি প্রথমে সন্দেহজনক হন। তাঁরা তখন তার চোখে লক্ষ্য করেন নাকের নিচের ঐ পরিচিত দাগটি। কৌশলে, এক পর্যায়ে, তাঁকে নিশ্চিত করতে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কে?’ তিনি সরলভাবে উত্তর দেন, ‘আমি মোজাফফর, মেয়ের বাবা।’ এর পরই তাকে হাতকড়া পরানো হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোররাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থান ও জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন মোজাফফর। সে রাতে, তিনি ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে আগানোর জন্য অগ্রসর হন। ঘটনাস্থলে, মোজাফফরই প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতিকে কক্ষ থেকে সরিয়ে এনে গুলি চালানোর দায়িত্ব পালন করেন। এই হত্যাকাণ্ডের পর, তিনি চট্টগ্রাম সেনানিবাসের জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এক সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠান—‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’ (প্রেসিডেন্ট নিহত হয়েছে)।
এরপর, রাষ্ট্রপতি হত্যার পর, সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনলে, মোজাফফর ভারতে প্রবেশ করেন। সেখানে, তিনি নিজের পরিচয় লুকানোর জন্য নতুন নাম গ্রহণ করেন, নিজেকে পরিবর্তন করেন চেহারা ও পোশাকের মাধ্যমে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করে, পুরোনো নামে কন্টাক্ট বন্ধ করে দেন এবং বিশ্বে বিভিন্ন দেশের পাসপোর্ট ভুয়া ডকুমেন্টের মাধ্যমে ভ্রমণ করেন। এই কারণে, দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ বা ইন্টারপোলের নজরে তিনি ধরা পড়েননি।
শেষ জীবনযাত্রায়, তিনি অত্যন্ত গোপনে দেশে ফেরেন ও রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকায়, বনানী ডিওএইচএসে অবস্থিত হন। সেখানে নিজেকে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেই প্রমাণ করতে চান। স্থানীয় প্রতিবেশীরা তার বিষয়ে কোনও সন্দেহ করেননি কারণ তিনি একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন না।
গ্রেপ্তার হওয়ার পর, আইনানুগ প্রক্রিয়ায়, ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, মোজাফফর হোসেন একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, যিনি কোর্ট মার্শাল অভিযুক্ত ও পলাতক। তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে, যেখানে তার বিচার চলবে। এভাবেই দীর্ঘ ৪৫ বছর পর, দেশের অন্যতম আলাদা মামলা এবং ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ জড়িত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ শেষ পর্যন্ত justice প্রতিষ্ঠা করেছে।









