ঢাকা | | | |

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে গণঅভ্যুত্থানের মহানায়ক জনগণ

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনও একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের স্বার্থের জন্য নয়; এটি দেশের সত্যিকার জনতার আন্দোলন। এই অভ্যুত্থানের মহানায়ক হচ্ছেন দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় সাধারণ মানুষ। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতার জন্য এক অনন্য লড়াই, আর ২০২৪ সালে এই গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশের এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য।

বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। তিনি সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ, গণআন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী এবং স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগের শাসনের সময়কার নির্যাতনের ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য ঐতিহাসিক নিদর্শন পরিদর্শন করেন। এরপর তিনি ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনাসভায় অংশ নেন।

আলোচনাসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনও একক নেতা বা গোষ্ঠীর একক প্রচেষ্টার ফল নয়, এটি দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় নাগরিকদের সম্মিলিত সংগ্রামের জয়। তিনি বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের লড়াই, আর ২০২৪ সালে ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষা করার সামগ্রিক আন্দোলন। জনগণ যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের ভুলবে না, তেমনি ২০২৪ সালে দেশের জন্য আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের স্মৃতি চিরজীবী থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ নিপীড়ন এবং গুম-আটঙ্কার শিকার হয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ নির্যাতন, হামলা ও মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর ঘরছাড়া ছিলেন।

তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে বহু ছাত্র, নারী ও শিশু শহীদ হয়েছেন এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। তিনি শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আহত ব্যক্তিদের পুনরায় সুস্থ হওয়ার জন্য প্রার্থনা করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিস্ট চক্র এই আন্দোলন ঠেকাতে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়েও মানুষ হত্যা করেছে। এই বর্বরতা ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংসতম দৃষ্টান্ত। তিনি বললেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন ও অপহরণের আইনত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যা স্বাধীনতার পরও অপ্রতিরোধ্য ছিল। এর সঙ্গে তুলনা চলে সাম্প্রতিক আমলে কিছু অস্থিরতামূলক ঘটনায়।

তিনি উল্লেখ করেন যে, এই ইতিহাসকে ধরে রাখতে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সাহসের ইতিহাস হিসেবে তাদের ইতিহাসের অংশ করে তুলবে। এই জাদুঘর শুধু ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের স্মৃতিই সংরক্ষণ করবে না, বরং বাংলাদেশের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসও এতে স্থান পাবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও মন্তব্য করেন, বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট চক্র কখনোই গণতান্ত্রিক শাসন মানতে প্রস্তুত নয়। তারা ১৯৭৫ সালের কবর রচনা করে দেশে স্বৈরাচার ফেরানোর চেষ্ঠা চালিয়েছে। অন্যদিকে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার শুরু করেন। এসব ইতিহাসের সংরক্ষণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রতিশ্রুতির দিক।

জাদুঘরে শহীদদের জীবনগাথা, আহতদের সাক্ষ্য, অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা, ছবি, ভিডিও, প্রতিবেদন, posters, কবিতা, নাটক ও অন্যান্য স্মারক সংরক্ষণের প্রত্যাশা প্রকাশ করেন এবং ব্যক্তিগত ও দলীয় স্মারক দাতাদের ধন্যবাদ জানান।

তিনি বলেন, ইতিহাসের সত্যতা নিশ্চিত করা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অর্ধসত্য বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়ে দেয়, বিভেদের কারণ হয়। তাই সর্বসম্মতভাবে সত্যের ভিত্তিতে ইতিহাস তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে, এই সব তথ্য বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষায়ও উপস্থাপনের আহ্বান জানান যাতে বিশ্বের মানুষ বাংলাদেশের সংগ্রামের ইতিহাস জানতে পারেন।

প্রধানমন্ত্রী জানান, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের শহীদদের জন্য তাদের এলাকায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হবে। তিনি আরও জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত বা শহীদ ব্যক্তিদের জন্য সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, বিশ্বস্ত চিকিৎসা সংস্থাগুলোতেও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বর্তমানে ৫০ জন আহত ব্যক্তি বিদেশে চিকিৎসাধীন আছেন। এছাড়া, দ্বাদশ হাজারের বেশি মুক্তিযোদ্ধাকে মান্য সম্মানী ভাতা দেওয়া হয়।

সরকার হতাহতদের জন্য সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর পাশাপাশি, দেশ পুনর্গঠনের জন্য ৩১ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কার্যক্রম ত্বরান্বিত হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধানে সংশোধন আনা হবে এবং একটি স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, বিভিন্ন ষড়যন্ত্রকারীরা অহেতুক ইস্যু সৃষ্টি করে পরিস্থিতি উসকে দিতে চাইছে। তারা কি না স্বৈরাচার পুনরুত্থানের পথ সুগম করছে, তা বিবেচনা করার জন্য সবাইকে আহ্বান জানান।

আন্তঃতিকভাবে, প্রধানমন্ত্রী ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠাতে অংশ নেওয়া স্থপতি, গবেষক, শিল্পী, সংগ্রাহক, কর্মকর্তা ও অন্যান্য সহযোগীদের ধন্যবাদ জানিয়ে, সেনাবাহিনীর সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেন। শহীদ পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করে বলেন, ‘এই বাংলাদেশ আর কখনওই তাঁবেদারি শাসনে ফিরে যাবে না।’ তিনি শেষ করেন এই স্মৃতি জাদুঘর এর উদ্বোধন ঘোষণা দিয়ে।