অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, গত সরকারের আমলে নেওয়া ১,৩০০টির বেশি উন্নয়ন প্রকল্প এখন বর্তমান সরকারের জন্য একটা বড় বোঝা বা লায়াবিলিটি। তিনি উল্লেখ করেন, এসব প্রকল্পের বেশির ভাগই কিছুটা অগ্রগতি লাভ করেছে, আবার অনেকগুলো এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। ফলে, এগুলো বাতিল করা বা ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারের জন্য এই প্রকল্পগুলো যেমন একতার জন্য সমস্যা সৃষ্টি করছে, তেমনি এগুলোর জন্য সাধারণ বাজেটের বরাদ্দের ওপর চাপও পড়ছে।
শুক্রবার (২৫ জুন) ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত ‘ডিবেটিং বাজেট অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন র্যাপিডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক। সভার সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্, এবং সঞ্চালনা করেন সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
অর্থমন্ত্রী জানান, বিগত সরকারের নেওয়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে অনেকেই অর্ধেক বা তার বেশি সম্পন্ন হয়েছে। পরিস্থিতি এমন যে, এগুলো বাতিল করাও সম্ভব নয় এবং এগুলোর জন্য অর্থ ব্যয় বন্ধ করা কঠিন। তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে এসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে এবং এখনো এগুলোর প্রকল্প বাস্তবায়ন চলছে। এর মধ্য থেকে কিছু প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে, তবে সবই বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি।
তিনি আরো বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বেশ কয়েকটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এর মাঝেই বৈশ্বিক অর্থনীতি পরিবর্তনের জন্য নতুন চিন্তার ও মডেলের উন্নয়ন করা হয়েছে।
বাজেটের নীতিগত মূল দর্শন তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী, যেখানে তিনি বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক করে তোলা। গত বছরগুলোতে অর্থনীতি বেশ পৃষ্ঠপোষকতামূলক ছিল, যার ফলে প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের অংশগ্রহণ কমে গেছে। এখন আমরা ঘরে, গ্রামে ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।
তিনি জানিয়েছেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য ফ্যামিলি কার্ড চালু করা হয়েছে, যা গ্রামের চাহিদা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াবে। পাশাপাশি কিষাণদের জন্য কৃষক কার্ড চালুর ঘোষণা দিয়েছেন, যাতে ঋণের বোঝা কমানো যায়। সরকার এখন মৌলিক চাহিদা—যেমন সার ও বীজ—মেটাতে কৃষকদের সহায়তা করছে। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে সব চাহিদা পূরণ সম্ভব হয়নি।
অর্থমন্ত্রী আরো জানান, সরকার সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যের সুবিধা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চয় বাড়াতে পারে। এর পাশাপাশি দেশের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি, মৃৎশিল্প ও তাঁতশিল্পের ব্র্যান্ডিং ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের শিল্প, থিয়েটার ও চলচ্চিত্রের বিকাশে পূর্বাচলে একটি থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থনীতির স্বচ্ছতার জন্য তিনি ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেন। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি সরাসরি মনিটরিং হবে এবং কোনও কাজের গতি মন্দ হলে তা ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে। এই ব্যবস্থায়, প্রকল্পের অগ্রগতির ওপর নজরদারির মাধ্যমে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে।
অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন, যদি বাজেটের শতকরা ৮০ শতাংশও বাস্তবায়ন হয়, তাহলে দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির জন্য ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।
সেমিনারে আলোচক ছিলেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিনসহ অন্যান্য গবেষক ও বিশেষজ্ঞ।









