বিগত ১৬ বছর ধরে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী সরকার সীমাহীন দুর্নীতি এবং লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি উল্লেখ করেন, শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নক্ষত্রের পতনই নয়, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
আজ (শুক্রবার) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ১৩তম দিনের অধিবেশনের প্রথম অংশে, স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সভাপতিত্বে, অর্থমন্ত্রী তার বিবৃতিতে এসব কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে দেশের দায়িত্ব গ্রহণের পটভূমি এবং আগামীর উন্নয়নের পথে কী ধাপ নেওয়া হবে, সে জন্য এক সারাংশ তুলে ধরছেন। বিএনপি একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, এবং সেই দায়িত্ব পালন করতে তারা দেশের জনগণের অংশীদারিত্বে বিশ্বাস করে।
অর্থমন্ত্রী ভাষণে বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুর্নীতির কারণে দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো যেমন দুর্বল হয়ে পড়েছে, তেমনি মূল অর্থনৈতিক সূচকগুলোও ক্রমশ সংকটে পড়েছে। ২০০৫-০৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ, আর মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৭.১৭ শতাংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার কমে গেছে, যেখানে ২০২৩-২৪ সালে প্রবৃদ্ধি ৪.২২ শতাংশে এবং মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, কৃষি খাতের অবদানও কম হয়েছে।
তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য আধুনিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় অনেক তরুণ এখন বাধ্যে বাধ্য হচ্ছেন কৃষিখাতে, যা শ্রমবাজারে অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে এবং উৎপাদনশীলতা ও আয় ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কৃষির অংশগ্রহণ মোট কর্মসংস্থানের ৪১ শতাংশ হলেও এর অর্থনৈতিক অবদান মাত্র ১১.৬ শতাংশ। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। সঞ্চয় ও বিনিয়োগের হারও কমে এসেছে; ২০০৫-০৬ সালে যেখানে সঞ্চয় ২৯.৯৪ শতাংশ ছিল, সেখানে ২০২৩-২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ২৮.৪২ শতাংশে।
মুদ্রার মানে ব্যাপক দরপতন ঘটেছে। যেখানে ২০০৫-০৬ সালে ডলারের বিপরীতে টাকা ছিল ৬৭.২ টাকা, সেখানে ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে ১২১ টাকা হয়েছে, এর ফলে আমদানির ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ দ্রুত বেড়ে চলেছে। মুদ্রা সরবরাহ ও দেশের রিজার্ভ কমে যাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও হ্রাস পেয়েছে, ২০২৪-২৫ সালে তা ৬.৫ শতাংশে নেমে এসেছে, যা ব্যাঙ্কিং খাতের তরলতা সংকট ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির মন্থরতার লক্ষণ। রাজস্ব আদায়ও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি; সরকারের সম্পদ আহরণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বাজেটের ঘাটতি ২০০৫-০৬ সালে যেখানে ২.৯ শতাংশ ছিল, তা বাড়তেপারে বর্তমানে ৪.০৫ শতাংশে। বিগত সরকারের সময়ে এলেঞ্জিতে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও, অধিকাংশেরই মূল্যায়ন বা সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই, দেশের সাধারণ মানুষ এর তেমন উপকার পায়নি বরং লুটপাটের মাধ্যমে লক্ষ কোটি টাকার পাচার হয়েছে।
ঋণের ব্যবস্থাপনায় দেখা যাচ্ছে, ২০০৫-০৬ সালে সুদ পরিশোধের জন্য ব্যয় ছিল ৮৫ বিলিয়ন টাকা, যা আজ অনেক গুণ বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ১১,৪৭০ বিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে। অভ্যন্তরীণ ঋণের উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা, বিশেষ করে এসএমই খাতের জন্য ব্যাংক ঋণের কঠিনতা তৈরি করেছে, যা বলে দিচ্ছে অর্থনৈতিক এগিয়ে যাওয়ার পথে এক চরম চ্যালেঞ্জ।
চিত্র স্পষ্ট, রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় নেতিবাচক, যা অর্থনৈতিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে ২০ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যদিও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের কারণে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আজকের বাংলাদেশ অর্থনীতি তার দুর্বলতাগুলোর মধ্য দিয়ে টিকে থাকছে, কিন্তু সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।









