ঢাকা | বৃহস্পতিবার | ৫ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৭ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

পাকিস্তান ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা—আইসিসির ক্ষতির আশঙ্কা হাজার কোটি টাকার

একজন ক্রিকেটারের নিয়োগ-চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত নয়; তা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কূটনীতি ও অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দিতে পারে—সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই বাস্তবতাই বহুল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তুলে এনেছে।

জাতীয় পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে ওঠা বিবাদ তা ভালো উদাহরণ। নিলামে আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্স মোস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে কিনে নিলেও পরে তাকে ছেড়ে দেয়। বিভিন্ন মহলে এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক চাপ থাকা-ই এক আলোচ্য বিষয়; ফলে খেলোয়াড়ের চুক্তির পুরো অর্থই হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি—এটি শুধু খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বিস্তৃত প্রভাবও ফেলেছে।

ঘটনাটিই বাংলাদেশের এবং ভারতীয় ক্রিকেট সম্পর্কের টানাপোড়েনকে সামনে এনেছে। সূত্রগুলোর অনুযায়ী বাংলাদেশ বিশ্বকাপ—যা ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের কথা ছিল—বর্জনের ঘোষণা দেয়। পরিস্থিতি আরও জটিল হয় যখন পাকিস্তানও প্রথমে বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেয়; পরে তারা জানায় পুরো টুর্নামেন্ট নয়, কেবল ভারতীয় দলের বিরুদ্ধে খেলা ম্যাচগুলো বর্জন করা হবে।

এখন এই সিদ্ধান্তগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েই আলোচনা প্রধানত স্থান করে নিয়েছে। আধুনিক ক্রিকেট শুধুই মাঠে ব্যাট-বলের লড়াই নয়; এটি সম্প্রচার, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বৈশ্বিক দর্শক-সংখ্যার ওপর নির্ভর একটি বিশাল শিল্প। বিশেষত বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে কিছু ম্যাচ থাকে ‘হাই ভ্যালু ইভেন্ট’ হিসেবে—তাদের মধ্যে ভারত–পাকিস্তান দ্বৈরথ বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে ভালো বাণিজ্যিক রসদ হিসেবে ধরা হয়।

বাজার বিশ্লেষক ও মিডিয়া রিপোর্টগুলো বলছে, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচগুলোর বিজ্ঞাপন ও সম্প্রচার মূল্য অত্যন্ত উচ্চ। কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এমন ম্যাচের ১০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন স্লটই বিক্রি হয় বহু লক্ষ রুপিতে এবং একটি ম্যাচ থেকেই বিজ্ঞাপন আয় কয়েকশো কোটি রুপির কাছাকাছি হতে পারে। এসব তথ্য ডিজিটাল ও রেডিও-টিভি সম্প্রচারের বাজারকে ঘিরে যত বড় বিনিয়োগ হয়ে থাকে, তার প্রেক্ষিতে গুরুত্ব বাড়ায়।

যদি নির্ধারিত বড় ম্যাচ বাতিল বা বর্জিত হয়, তাহলে সরাসরি ক্ষতি হবে টিকিট বিক্রয়, লাইভ সম্প্রচার রাইটস, স্পনসরশিপ চুক্তি ও বিজ্ঞাপন আয়সহ অনেক ক্ষেত্রেই। সম্প্রচার স্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠানগুলো টুর্নামেন্টের জন্য আগেই বড় অঙ্কের অর্থ দেয়—তার ওপরই তাদের রিটার্ন নির্ভর করে। এই ধরনের অবস্থায় আইসিসি-র ওপর ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিগত দাবি ওঠার সম্ভাবনা থাকে, এবং সম্মিলিতভাবে ক্ষতিটি হিসাব করলে তা হাজার কোটি টাকার ঘরে পৌঁছতে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকরা আশংকা করছেন।

এ প্রসঙ্গেই একটি বৃহৎ সম্প্রচার সংস্থা—প্রতিবেদন অনুসারে—এর আগেই সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির কথা তুলেছে। এদের বিনিয়োগ ও প্রত্যাশিত রিটার্নের অনুপাতে যদি হাই ভ্যালু ম্যাচগুলো না হয়, তাহলে আয়ের বড় অংশই লোপ পাবে। একই সঙ্গে স্পনসরদের ব্র্যান্ড এক্সপোজার কমে যাবে, এবং চুক্তিভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হবে না।

বাংলাদেশের কথাও আলাদা নয়। কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট মিস করলে বোর্ড ও খেলোয়াড়রা যে আর্থিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে—ভুক্তভোগী হবে টুর্নামেন্ট ফিসহ, সম্প্রচার রাজস্বের ভাগ ও স্পনসরশিপ—সব মিলিয়ে তা লাখ লাখ ডলার বা কোটি টাকার ক্ষতি হিসাব করা যায়। তাই কেবল একটি খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে নেওয়া সিদ্ধান্তও দেশের ক্রিকেট অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

সংক্ষেপে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে আধুনিক ক্রিকেট কেবল ক্রীড়া নয়; এটি কূটনীতি, করপোরেট বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক দর্শকবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। একজন খেলোয়াড় সংক্রান্ত বিতর্কও তখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় আর্থিক ও কূটনৈতিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষ—আইসিসি, দেশের ক্রিকেট বোর্ড, সম্প্রচারক ও স্পনসররা—এ সময়ে নানা আর্থিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপের মুখে পড়েছেন।

(আজকালের খবর/ এমকে)