বাংলাদেশে ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসের কারণে হতাহত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েই চলেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, শুধুমাত্র এই বছরই মব সন্ত্রাসে ১৯৭ জন নিহত হয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ে নিহতের সংখ্যার চেয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। গত বছর ওই সময়ে নিহতের সংখ্যা ছিল অন্তত ১২৮ জন। এ তথ্যগুলো ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫: আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আসকের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ, দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট ও সরেজমিন তদন্তের ভিত্তিতে জানা গেছে, এই বছর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীন সময়ে কমপক্ষে ২৯৩ জন মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন। এই সময়ে নারী, পুরুষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনেক মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি মুক্তিযোদ্ধা, বাউল সম্প্রদায়ের সদস্যদের হেনস্তা, মারধর ও জুতার মালা পরানোর মতো ঘটনা ঘটেছে।
নগরাঞ্চলে, বিশেষ করে ঢাকায় এই বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মৃত্যু ঘটেছে, যেখানে ঢাকায় ২৭, গাজীপুরে ১৭, নারায়ণগঞ্জে ১১, চট্টগ্রামে নয় ও কুমিল্লায় আটজনের মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহ, বরিশাল, নোয়াখালী, গাইবান্ধা ও শরীয়তপুরে ছয়জন করে প্রাণ হারান। লক্ষ্মীপুর ও সিরাজগঞ্জে পাঁচজন করে এবং নরসিংদী, যশোরে চারজন করে মারা গেছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে গণপিটুনির ঘটনা বেড়েছে, যেখানে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তত সাতজন, নারী তিনজন এবং এক ব্যক্তি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীও নিহত হয়েছেন। এই ঘটনায় সামাজিক ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীগুলোর ওপর সহিংসতার প্রভাব স্পষ্ট। আসক জানায়, এই সহিংসতার পেছনে মূলত রাজনৈতিক ভিন্নমত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, গুজব ও আধিপত্য বিস্তার বিষয়ক সংঘর্ষ রয়েছে।
এছাড়াও, ২০২৫ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবিরোধী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এই বছর বিচারবিরোধী হত্যা, যৌথ বাহিনীর হেফাজত, গুলি চালিয়ে হত্যা ও থানায় হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় অন্তত ৩৮ জন নিহত হন। এর মধ্যে ২০২৪ সালে এই ধরনের হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ২১। দেশের বিভিন্ন কারাগারে, বিশেষ করে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, কমপক্ষে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়; এর মধ্যে ৬৯জন হাজতি ও ৩৮জন কয়েদি।
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালে ১৮ ডিসেম্বর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে পরিকল্পিত হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এই হামলায় সাংবাদিক ও কর্মীদের নিরাপত্তা জটিল হয়ে পড়ে, পাশাপাশি পত্রিকাগুলোর মুদ্রিত ও অনলাইন সংস্করণ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে।
আসক আরও বলেছে, বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ ও সীমিত, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের জন্য রাষ্ট্রীয় চাপ ও মামলার শিকার হতে হয়। এই পরিস্থিতি স্বাধীন ও সংস্কারমুখী গণতান্ত্রিক পরিবেশকে আরও সংকুচিত করছে।
বছরজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত ও প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৩৮১ জন, যার মধ্যে তিনজন নিহত ও চারজনের মরদেহ রহস্যজনকভাবে উদ্ধার হয়।
অপরদিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বিভিন্ন হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৪২টি ঘটনা ঘটেছে। এতে বসতঘর অগ্নিসংযোগ, মন্দিরে হামলা, প্রতিমা ভাংচুর ও জমি দখলের ঘটনা চোখে পড়েছে। এসব ঘটনায় একজন নিহত ও অন্তত ১৫ জন আহত হন। পাশাপাশি, একই সময়ে একটি বৌদ্ধ মন্দিরেও হামলার ঘটনা ঘটে।









