ঢাকা | | | |

রাষ্ট্রপতি: স্বাধীন দেশে কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না

রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকতে দেওয়া হবে না। তিনি এই দৃঢ় ঘোষণা দেন যে গুমের সঙ্গে জড়িত যেকোনো ব্যক্তিকে যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তাদের কঠোর আইনানুগ শাস্তির মুখোমুখি করা হবে এবং শাসনতন্ত্রের আওতায় তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে।

রবিবার (৩০ আগস্ট) ঢাকায় বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে প্রদত্ত ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি আরও জানান, তিনি আজ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রতি হিসেবে পরিষ্কার বলে বলতে চান, এই স্বাধীন দেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না। কোনো মা-ই তার সন্তান হারাতে চাইবে না, কোনো স্ত্রী চোখের জলে স্বামীর জন্য আকুল হবে না।

তিনি গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়। এটি একটি মানবতা বিরোধী অপরাধ, যা একজন ব্যক্তিকে কেড়ে নেয় না শুধুমাত্র, বরং তার পরিবারের হাসি-খুশি, শান্তি, স্বপ্ন ও সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্বস্তিও কেড়ে নেয়। এটি একদম জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন।

মির্জা ফখরুল বলেন, সংবিধানে নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা, ব্যক্তির স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গুম-খুনের মাধ্যমে এই সব অধিকার একত্রে লঙ্ঘিত হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম ও গোপন কারাগার বাংলাদেশের ওপর নিষ্ঠুরভাবে চেপে বসেছিল। আন্দোলনকারী, ভিন্ন মত প্রকাশকারী ও গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের পথে যারা এগিয়ে ছিলেন, তাদের অনেককে তুলে নিয়ে গুম করা হয়েছে বা গোপনে হত্যা করা হয়েছে।

তিনি নাম উল্লেখ করে বলেন, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম, ওয়ার্ড সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ অগণিত মানুষ এই জুলুমের শিকার হয়েছেন। তাদের পরিবারের সদস্যরা এখনো বিপদে, অনিশ্চয়তায় ও অপেক্ষার প্রহরে দিন কাটাচ্ছেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আইনজীবী ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমী, ভিন্ন মতাবলম্বী লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী, গৃহবধূসহ সাধারণ নাগরিকদের বছর বছর গুমের শিকার করে কারাগারে আটকে রাখা হয়। বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকেও গুম করে ভিনদেশে পাঠানো হয়েছে। কিছু ব্যক্তির ফিরে আসলেও অনেকের এখনও খোঁজ নেই।

গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, কমিশন মোট ১৫৬৯টি গুমের ঘটনা চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ২৮৭ জন এখনো নিখোঁজ বা মৃত। নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে গুম ও গোপনে হত্যা করার চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

তিনি উল্লেখ করেন, এই কমিশনের প্রতিবেদন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি সৃষ্টি করেছে, তবে এখনও পথ খুব বেশী দূর। গুমের শিকার ব্যক্তিদের ও তাদের পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত ও গুমকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ চুক্তিতেও স্বাক্ষর করেছে।

রাষ্ট্রপতি এ জন্য পরিবারগুলোর দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু অপরাধীদের কঠোর শাস্তিই যথেষ্ট নয়। বছরের পর বছর প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করা পরিবারের সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবনযাত্রা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

সভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।