রাজধানীতে নিরাপদ পানির সরবরাহ, আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা—এমন বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে ঢাকা ওয়াসা। এই পরিস্থিতিতে সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রখ্যাত পানি সম্পদ বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলী ড. সব্বির মোস্তফা খানকে ঢাকা ওয়াসার নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগের প্রধান হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে জলসম্পদ ও নগর জলাবদ্ধতা বিষয়ে কাজ করে আসছেন। রবিবার (২ আগস্ট) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এই নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৫’-এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী, তাকে তিন বছরের জন্য এই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনিক পরিবর্তনের পাশাপাশি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কারণ ড. সব্বির মোস্তফার গবেষণা ও উদ্যোগমূলক অভিজ্ঞতা নগর জলসম্পদ, ড্রেনেজ ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো অনুপ্রেরণাদায়ক ক্ষেত্রগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে। তাঁর প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে জলসম্পদ, নদী ব্যবস্থাপনা, বন্যা ও জলাবদ্ধতা সমস্যা নিয়ে গভীর গবেষণা ও প্রকৌশল শিক্ষায় নিবেদিত হয়েছেন। ১৯৯৬ সালে বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও পরে পানি সম্পদ কৌশলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি করেন।
তিনি ১৯৯৭ সালে বুয়েটে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং ধাপে ধাপে সহকারী, সহযোগী ও অধ্যাপক হিসেবে উন্নীত হন। বর্তমানে তিনি পানি সম্পদ কৌশল বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর গবেষণার মুখ্য ক্ষেত্রগুলো হলো নগর জলাবদ্ধতা ও ড্রেনেজ, নদীর প্রবাহ ও গতিপ্রকৃতি, বন্যা পূর্বাভাস, জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পরিবেশ ও সামাজিক মূল্যায়ন (ESIA), এবং হাইড্রোলজিক্যাল ও হাইড্রোডাইনামিক মডেলিং। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব বিষয় বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ড. সব্বির মোস্তফা খান ৫০টির বেশি জাতীয় অবকাঠামো প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় কাজ করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতু সংযোগ সড়ক, কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, পায়রা সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী নদীর জেটি নির্মাণ, রাজউকের ড্রেনেজ পরিকল্পনা এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা কাজের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি টিম লিডার, পানি বিশেষজ্ঞ, হাইড্রোলজিস্ট ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ হিসেবে এসব প্রকল্পে কাজ করেছেন।
তার ৪০টির বেশি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল Springer, ASCE, Journal of Water and Climate Change, SN Applied Sciences প্রভৃতি বিভিন্ন পাবলিকেশনে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি ৩০টির বেশি গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা ও ৩৫ জনের বেশি এমএস ও পিএইচডি শিক্ষার্থীর তত্ত্বাবধান করেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান (আইইবি)-এর সম্মানীয় সাধারণ সম্পাদক ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন।
একজন নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে, ড. সব্বির মোস্তফাকে প্রধানত ঢাকার জলসম্পদ ও পানির নিরাপত্তা উন্নতির জন্য নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন পানির সরবরাহ নিশ্চিত করা, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প উৎস ব্যবহার বাড়ানো। এছাড়া, আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ, এবং সেবার মান ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধি করাও তাঁর অগ্রাধিকার।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নিয়োগের মাধ্যমে ঢাকার পানি ও জলব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘ দিনের গবেষণা, আন্তর্জাতিক শিক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা কোথা থেকে কাজে লাগানো হবে। ফলে ঢাকা শহরের দ্রুত নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জলাবদ্ধতা, নদী দূষণ, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া এবং নিরাপদ পানির চাহিদা পূরণ করার জন্য তাঁর নেতৃত্ব ও পরিকল্পনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে প্রত্যাশা।









