ঢাকা | সোমবার | ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | ২৯শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি

তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর: অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো বিদেশ সফর শুরু হলো মালয়েশিয়া দিয়ে। তিনি আগামী ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া পৌঁছাবেন এবং এরপর চীনে তার পরিকল্পনা রয়েছে। এই সফরটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি দেশের বৈদেশিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক স্বার্থ, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভূরাজনৈতিক রণকৌশল বদলের একটি সূচক হিসেবে বিবেচনা করছে বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকদের মতে, গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে নির্বাচন করা ছিল একটি বাস্তবসম্মত ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এই সফরে দুই দেশের পারস্পরিক বন্ধুত্ব আরও দৃঢ় হবে বলে প্রত্যাশা করছেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচনের বিজয় পাওয়ার পরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নেতা-নেত্রীরা প্রধানমন্ত্রীর জন্য শুভেচ্ছা ও সফর আমন্ত্রণ পাঠিয়েছেন, যেমন নরেন্দ্র মোদি, লি কিয়াং, এবং আনোয়ার ইব্রাহিম। তবে তিনজনের মধ্যে প্রথম সফরটা মালয়েশিয়ার দিকে থাকায় বাংলাদেশের প্রবাসী বাঙালিরাও এ সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখছেন।

অধিকাংশ প্রবাসী এবং ব্যবসায়ীর আশা, এই সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশি জনগণের জন্য মালয়েশিয়ার সরকার থেকে বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত হবে। দুই দেশের ব্যবসাবান্ধব সম্পর্ক আরও মজবুত হবে, ফলস্বরূপ বিনিয়োগ বাড়বে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা জোরদার হবে। বিশেষ করে বাংলাদশের শ্রমিকরা মালয়েশিয়ায় কাজের সুযোগ প্রাপ্তি আরও সহজ হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও কার্যকর করার ব্যাপারে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা পাওয়ার প্রত্যাশাও করা হচ্ছে। সার্বিকভাবে, এই সফর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের এক নতুন দিগন্তে পৌঁছানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ এক পদক্ষেপ।

উল্লেখ্য, মালয়েশিয়া মুসলিম বিশ্বের সংগঠন ওআইসি’র সদস্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কমপ্লেক্স, আসিয়ানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই সফর আঞ্চলিক ও মুসলিম বিশ্ব সম্পর্কের গভীরতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের বহুমাত্রিক স্বার্থকে সামনে আনা সম্ভব করবে। মূল বিষয়ে উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে কিছু সমস্যা ও অস্বচ্ছতা প্রকাশ পেয়েছে; ২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে শ্রমিক নিয়োগ স্থগিত থাকলেও, বাংলাদেশের নতুন সরকার এই পরিস্থিতি সবিস্তারে বুঝে নিতে ও শ্রমিক প্রেরণের প্রক্রিয়া দ্রুত স্বাভাবিক করতে চায়।

আলোচনায় উঠে এসেছে, মালয়েশিয়ার জবাবে কী ধরনের শর্ত দেওয়া হয়েছিল, ওয়েবসাইটে তালিকাভুক্ত এজেন্সিগুলোর নিয়োগ পর্যবেক্ষণ, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক প্রেরণ ও নিয়মনীতি লঙ্ঘনের কারণে মানব পাচার ও অর্থপাচার মামলাও হয়েছে। বাংলাদেশ অদ্যাবধি এই মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতে পারেনি, ফলে মালয়েশিয়া বিরক্ত। তবে মালয়েশিয়ার প্রতি তাদের আস্থা বৃদ্ধি করতে কাজ করছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও প্রযুক্তির ব্যবহার।

বাংলাদেশের নির্বাচনী লক্ষ্য, অর্থাৎ ৫ বছরের মধ্যে এক কোটি বৈদেশিক বেতনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য মালয়েশিয়ার সঙ্গে আরও নিবিড় সম্পর্ক বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। দ্বিপাক্ষিক কাজের অংশীদারিত্ব ও শ্রম বিনিয়োগকে এগিয়ে নেওয়া এই লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হবে। এতে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের রফতানি পণ্য মূলত তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও পাটজাত সামগ্রী। বিপরীতে মালয়েশিয়া আমদানি করে পাম অয়েল, এলপিজি, রাসায়নিক, ইস্পাত ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী। এখন ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় রয়েছে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য আলোচনা, বিনিয়োগ বাড়ানো ও রপ্তানি সম্প্রসারণ। বিশেষ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়া, দুই দেশের মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) স্বাক্ষরও আলোচনা মূল বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এফটিএ বাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক কমবে, ভারত ও চীনের বাজারের মতো বিশ্ববাজারে প্রবেশের সহজতা বাড়বে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। এ বৈঠকগুলো মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আঞ্চলিক গুরুত্বও বৃদ্ধি পাবে।

প্রখ্যাত রাষ্ট্রনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭০-এর দশকে শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের সূচনা। এই সময়ে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি, যেমন বাণিজ্য, পরিবহন, কারিগরি সহযোগিতা, দ্বৈত করনীতি, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে।

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর কে কেবলমাত্র দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রতিনিধিত্ব মনে করলে ভুল হবে। এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতারও অংশ। আসিয়ানের সদস্য হওয়ার জন্য বাংলাদেশ দীর্ঘদিন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, এবং এই সফর সেই অঙ্গীকার পূরণে সহায়তা করতে পারে। শিক্ষার উন্নয়ন, গবেষণা, দক্ষতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা আশা করা হচ্ছে।

প্রতিটি পদক্ষেপের পেছনে আছে ভবিষ্যৎবাংলাদেশের জন্য সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। মালয়েশিয়া সফর শুধুমাত্র সৌজন্য নয়, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নতুন দিক নির্দেশনা, অর্থনৈতিক কৌশল ও আঞ্চলিক মর্যাদার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।