ঢাকা | বুধবার | ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ | ১৬ই শাবান, ১৪৪৭ হিজরি

নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন শুল্ক চুক্তি: ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন ও উদ্বেগ

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় শুল্ক চুক্তি করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ওয়াশিংটন ডিসিতে চুক্তি সই হওয়ার কথা থাকায় ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষক মহলে প্রশ্ন ও উদ্বেগ বাড়ছে, কারণ চুক্তির খসড়া ও শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

সরকারের দাবি, চুক্তি সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখার শর্তে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করা হয়েছে। ফলে কোন শর্তগুলো চুক্তিতে রাখা হয়েছে — তা ব্যবসায়ী, বাজার এবং জনসাধারণের কাছে অজানা রয়েছে। এই গোপনীয়তাই উদ্বেগের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

বাণিজ্য সম্প্রসারণের সম্ভাবনা থাকলেও ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন, এসব সুবিধার বিনিময়ে কী ধরনের বাধ্যতামূলক শর্ত মানতে হবে এবং তা দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাজারে কী প্রভাব ফেলবে—এইসব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনিশ্চয়তা রয়েছে।

তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান বলেন, চুক্তির খসড়া নিয়ে অতি দ্রুত আলোচনা প্রয়োজন। তিনি বলেছেন, ‘এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি কারা উপকৃত হবে এবং কারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে—তা না জেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া যথাযথ নয়।’ তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে সুফল মিললেও, নির্বাচনের ঠিক আগে চুক্তি সই করার বিষয়টি তাঁকে বিস্মিত করেছে।

রপ্তানিকারীদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ৬০০ কোটি ডলার, বিপরীতে আমদানি প্রায় ২০০ কোটি ডলার। এই বর্ধিত ব্যবধান কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র পণ্যের প্রবেশ আরও সহজ করতে বাংলাদেশি বাজার উন্মুক্ত করার শর্ত রাখতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খলে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের উদ্বেগ ব্যক্ত করেছেন। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, চুক্তির খসড়া সম্পর্কে কিছুই জানা না থাকায় মন্তব্য করা কঠিন। তাঁর বিবেচনায় এ ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের অনুমোদন থাকা অবস্থায় নেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতো।

বিশ্লেষকেরাও সতর্কতা জাহির করেছেন। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, চুক্তিটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না এবং খসড়া গোপন রাখায় এর সুফল-অসুবিধা বিচার করা যাচ্ছেনা। তাঁর মতে, নির্বাচন হয়ে গেলে রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যভাবে আলোচনা করতে পারত।

সরকারি সূত্র বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি, উৎস বিধি, জাতীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য বাণিজ্যসংক্রান্ত শর্ত যুক্ত করতে চায়। এছাড়া কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশ, এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

অভিযোগ আছে, নির্বাচনের ঠিক আগে এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করা হলে স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন আসবেই। বিশ্লেষকরা মনে করেন, চুক্তি সইয়ের সময় কিছুটা পিছিয়ে এনে নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে পর্যালোচনা করলে তা জনআস্থা বাড়াতো। তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বিতর্ক আরো জোরালো হয়েছে।

এ বৈঠক ও চুক্তি নিয়ে আলোচনার মাঝেই অন্তর্বর্তী সরকার আরও কয়েকটি বড় অবকাঠামোগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—গত বছরের নভেম্বরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গার লালদিয়ায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি এবং বুড়িগঙ্গার তীরে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সংক্রান্ত কিছু চলমান প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্তের প্রভাবও দীর্ঘমেয়াদি হবে।

সোমবার বিকেলে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলে এগুলো নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এটা চলমান প্রক্রিয়া।’ চলমানতার এই ব্যাখ্যা ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের অনিশ্চয়তা কাটাতে কতটা যথেষ্ট হবে, তা সময়ই বলবে।

সংক্ষেপে, নির্বাচনের ঠিক আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনীয়তা জুড়ে এমন এক শুল্ক চুক্তি ঘোষণা হওয়ায় দেশের ব্যবসায়ী, শিল্প ও নীতি বিশ্লেষকরা স্পষ্টতা, স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব সম্পর্কে ব্যাখ্যা দাবি করছেন। চুক্তির খসড়া প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত উদ্বেগ ও প্রশ্ন অমিট থেকেই যাচ্ছে।